আরও দেখুন
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় সামরিক হামলা চালাতে পারে—এমন ইঙ্গিত পাওয়ার পর জ্বালানি তেলের দাম আবারও বেড়েছে। ডিসেম্বরের ব্রেন্ট ফিউচার্স কন্ট্রাক্টের মেয়াদ আজ শেষ হচ্ছে; এটির দর ব্যারেলপ্রতি $116 ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে, জানুয়ারি মাসের কন্ট্রাক্টের ক্ষেত্রে $112-এর কাছাকাছি ট্রেডিং করা হচ্ছে। ডিসেম্বরে ডেলিভারির জন্য নির্ধারিত ডব্লিউটিআই গ্রেডের তেলের দর প্রায় 1% বেড়ে $103.01-এ পৌঁছেছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদন এই পরিস্থিতির সূত্রপাত ঘটিয়েছে। পত্রিকাটির তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন সামরিক কমান্ডার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের বিকল্পগুলো সম্পর্কে অবহিত করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তিনি তেহরানের ওপর পুনরায় বিমান হামলা শুরু করতে পারেন। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে একটি সংক্ষিপ্ত অথচ তীব্র অভিযানের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছে। বুধবার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যে বিষয়টি তেহরানও স্বীকার করেছে। এখন মনে হচ্ছে, ইরানের অন্যতম প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ কঠোর অবস্থান নিয়েছেন; তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুদ্ধ অবসানের ক্ষেত্রে ইরান তাদের দাবির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেবে না। ফলে, বুধবার যে কূটনৈতিক সুযোগের কারণে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমলেও আজ আবার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
উল্লেখ্য যে, অক্টোবরে ব্রেন্ট ক্রুড গ্রেডের জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং টানা চতুর্থ মাসের মতো মূল্যবৃদ্ধির পথে রয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ পুনরায় সচল হওয়া সত্ত্বেও এমনটা ঘটছে—যদিও সেখানে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে উচ্চ ঝুঁকি বিদ্যমান, তবুও উৎপাদকরা পণ্যবাহী জাহাজ পাঠাতে সক্ষম হচ্ছেন। অপর দিকে, মজুত ভাণ্ডারের স্বল্পতা এবং পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের ঘাটতি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে ইন্ধন জোগাচ্ছে—যার অন্যতম কারণ হলো রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলা।
পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা অনেকাংশেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে। অনেক বিশ্লেষক এই নির্বাচনকে জ্বালানি তেলের মূল্যের পরবর্তী বড় ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবক হিসেবে দেখছেন। নির্বাচনের পর সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা এখন আরও অনিশ্চিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, যদিও এমনিতেই বেশ নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে। এদিকে, ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও অস্পষ্ট রয়ে গেছে: নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি আসন পেয়েছে, যেখানে প্রধান বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। সরকার গঠনের জন্য এটি যথেষ্ট নয়; তাদের আরও মিত্রের প্রয়োজন হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার লক্ষ্যে দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল।
স্পট মার্কেটেও জ্বালানি তেলের মূল্যেও উত্তেজনার ছাপ স্পষ্ট। গতকাল শেলের সিইও ওয়ায়েল সাওয়ান বলেছেন, জ্বালানি তেলের বর্তমান মূল্য আর সাময়িক কোনো ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে না, কারণ বিশ্বজুড়ে জ্বালানির মজুত মারাত্মকভাবে কমে গেছে। আজ এক্সন মবিল এবং শেভরনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে; তাদের মন্তব্য থেকে বোঝা যাবে যে, বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলো চাহিদা ও সরবরাহের বর্তমান পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছে। এই ধরনের মূল্য রপ্তানিকারক ও তেল কোম্পানিগুলোর জন্য লাভজনক হলেও, ভোক্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং নির্বাচনের প্রাক্কালে রিপাবলিকানদের উপর এটি সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়—কারণ তেলের উচ্চমূল্য মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দেয় এবং ফেডারেল রিজার্ভ মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানে অটল থাকার সুযোগ পায়।
আমার ধারণা, ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ব্রেন্ট ক্রুড গ্রেডের জ্বালানি তেলের মূল্য $110-এর উপরেই থাকবে। যদি কোনো হামলার প্রস্তুতি নিশ্চিত হওয়া যায় অথবা ট্যাঙ্কারগুলোর ওপর নতুন কোনো আক্রমণ ঘটে, তবে তেলের মূল্য অনায়াসেই $118–$120 ছাড়িয়ে যেতে পারে। বড় ধরনের দরপতনের সম্ভাবনা কেবল তখনই তৈরি হতে পারে, যদি ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধবিরতির দিকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেয়—কিন্তু গালিবাফের বক্তব্যে তেমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। নির্বাচনের পর পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে; আর ট্রাম্প যদি সত্যিই কোনো সাম্রিক অভিযান শুরু করেন, তবে জ্বালানি তেলের মূল্য আরও একবার ব্যাপকভাবে ঊর্ধ্বমুখী হবে।
জ্বালানি তেলের মূল্যের বর্তমান টেকনিক্যাল চিত্র অনুযায়ী, ক্রেতাদের জ্বালানি তেলের মূল্যকে নিকটস্থ রেজিস্ট্যান্স $105-এ নিয়ে যেতে হবে। এতে করে জ্বালানি তেলের মূল্যের $109-এর লক্ষ্যমাত্রার দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা ব্রেক করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং হবে। পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে $112 এরিয়া নির্ধারণ করা যেতে পারে। যদি তেলের দরপতন হয়, তাহলে মূল্য $101-এ থাকা অবস্থায় বিক্রেতারা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। তারা সফল হলে এই রেঞ্জ ব্রেক করে মূল্য নিম্নমুখী হলে সেটি বুলিশ পজিশনের উপর উল্লেখযোগ্য আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তেলের মূল্য $98 পর্যন্ত নেমে যেতে পারে, যেখানে পরবর্তীতে $95 পর্যন্ত দরপতনের সম্ভাবনাও রয়েছে।